ঢাকা শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মার্কিন অবরোধেও থামেনি ইরানের অস্ত্র আমদানি

অনলাইন ডেস্ক
১ ঘন্টা আগে
মার্কিন অবরোধেও থামেনি ইরানের অস্ত্র আমদানি
যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে সামরিক সরঞ্জাম আমদানির জন্য পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের একটি বিশাল গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ইরান। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক তৈরির উপাদান ও ভারী যানবাহন আমদানি করা হয়েছে। রকেটের জ্বালানি তৈরির রাসায়নিক থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান—সবকিছু সংগ্রহে ব্যবহার করা হচ্ছে জটিল মধ্যস্থতাকারী ও বিদেশি কোম্পানির ব্যবস্থা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং দেশটির প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই নেটওয়ার্ক কীভাবে সামরিক সরবরাহব্যবস্থাকে সচল রেখেছে।

পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সামরিক সরবরাহব্যবস্থা
রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ইরান সামরিক সরঞ্জাম আমদানির জন্য পাঁচ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামের শুরুতে রয়েছে ‘এমওডি’ অথবা ফারসি ভাষায় ‘ভিওডিজেএ’। প্রতিটি নামের সঙ্গে পাঁচ বা ছয় অঙ্কের একটি সংখ্যা কথায় লেখা থাকে।

অদ্ভুত বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হিসেবে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তেহরান কার্যালয়ের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নথিতে প্রতিষ্ঠার তারিখ দেখানো হয়েছে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। দিনটি ইরানের ইসলামি বিপ্লবের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তারিখ।

তবে করপোরেট নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান প্রকৃতপক্ষে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সে সময় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের তেল রপ্তানি ও বৈদেশিক মুদ্রাব্যবস্থা ব্যাপক চাপে পড়ে।

রয়টার্স বলছে, এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে আইআরজিসি এবং দেশটির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ‘বুনিয়াদ’ নামে পরিচিত ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। ২০১৬ সাল থেকে বিভিন্ন পণ্যের চালান, জাহাজ পরিবহন ও আর্থিক নথিতে এসব প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

মধ্যস্থতাকারী ও ভুয়া কোম্পানির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন
ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের এই ব্যবস্থায় বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী ও বিদেশি কোম্পানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব মধ্যস্থতাকারীকে সম্মিলিতভাবে ‘ট্রাস্টি’ বলা হয়।

রয়টার্সের পর্যালোচনা করা চালানের ৯৭ শতাংশের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধ হয়েছে সরাসরি মুদ্রা স্থানান্তর ছাড়াই। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রচলিত সরাসরি অর্থ লেনদেন এড়িয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় আমদানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে চীন, রাশিয়া ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সামরিক ও দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য সংগ্রহ করেছে ইরান। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে রকেটের জ্বালানি তৈরির রাসায়নিক, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং ভারী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান।

রয়টার্সের ভাষ্য অনুযায়ী, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানের সামরিক সরবরাহব্যবস্থাকে সচল রাখার ক্ষেত্রে এই নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ফাঁস হওয়া ব্যাংক নথি থেকে যেভাবে সামনে এল নেটওয়ার্ক
ইসরায়েলি-আমেরিকান ঝুঁকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ২৪০ অ্যানালিটিকসের সঙ্গে যৌথভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে নেটওয়ার্কটির অস্তিত্ব শনাক্ত করে রয়টার্স।

প্রতিষ্ঠানটির অর্থনীতিবিদ নোয়াম বিনস্টক ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ব্যাংক সেপাহের ফাঁস হওয়া নথি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রথম এই ব্যবস্থার সন্ধান পান। আইআরজিসি সদস্যদের বেতন-ভাতা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যাংকটির কিছু নথি টেলিগ্রাম ও উইকিইরান ওয়েবসাইটে ছড়িয়ে পড়েছিল।

নথিতে দেখা যায়, ২০২৪ সালের শেষ দিকে ৩৬টি প্রতিষ্ঠানের কাছে বৈদেশিক মুদ্রায় প্রায় ১২০ কোটি ডলার ছিল। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে স্থানীয় মুদ্রায় জমা ছিল প্রায় ১৮০ কোটি ডলার।

পরে বিনস্টক বুঝতে পারেন, এসব প্রতিষ্ঠান তেল বিক্রির অর্থ গ্রহণ করে সামরিক ও দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য সরঞ্জাম আমদানিতে ব্যয় করছে।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য রয়েছে ১১ অঙ্কের আলাদা পরিচিতি নম্বর। জাহাজ পরিবহনের নথি, পণ্যের চালান ও ব্যাংক হিসাবেও একই নম্বর ব্যবহৃত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সম্পর্ক শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

এরপর প্রায় ১৯ হাজার আমদানি নথির একটি অংশ জাহাজ চলাচলের কাগজপত্র, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও, স্যাটেলাইট চিত্র ও ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করে রয়টার্স।


কমেন্ট বক্স