কক্সবাজারের টেকনাফে জিম্মি থাকা মানুষদের উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত সেনাবাহিনীর সদস্য মো. তিতাস শেখের (২৮) বাড়িতে চলছে মাতম। তার মৃত্যুর খবরে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাড়ির পরিবেশ।
তিতাস উপজেলার লস্করদিয়া ইউনিয়নের লস্করদিয়া গ্রামের আফজাল হোসেন ও রেখা বেগম দম্পতির বড় ছেলে। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে কর্মরত ছিলেন। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবার বড়।
সেনাবাহিনীর সঙ্গে তিতাসের পরিবারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তার বাবা আফজাল হোসেন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য। ছোট ভাই আকরাম হোসেনও কর্মরত রয়েছেন সেনাবাহিনীতে। ২০১৭ সালে সৈনিক পদে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিতাস। চার বছর আগে পাশের বারখাদিয়া এলাকার টুলু শেখের মেয়ে সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে বিয়ে হয় তিতাসের। এই দম্পতির কোনো সন্তান ছিল না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন তিতাস। স্বামীকে কাছে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন সুমাইয়া। কিন্তু একটি অভিযানে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করায় অপূর্ণই থেকে গেল তাদের একসঙ্গে থাকার স্বপ্ন।
স্বজনদের কাছে তিতাসের শেষ কথাগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। গত বুধবার রাতে মায়ের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়েছিল তার। তখন তিনি মাকে বলেছিলেন, ‘আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো মা।’ ছেলের মুখে এমন কথা শুনে মা রেখা বেগম দোয়া করেছিলেন। কিন্তু সেই কথোপকথনই যে ছেলের সঙ্গে তার শেষ কথা হবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি তিনি।
পারিবারিক ও প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, রামু সিএমএইচ থেকে শহীদের মরদেহ আনতে সেখানে যান তাঁর ছোট ভাই আকরাম হোসেন। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সেনাবাহিনীর ব্যবস্থাপনায় হেলিকপ্টারযোগে তিতাসের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে বিকেল ৪টার মধ্যে সেনাসদস্য তিতাসকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হবে। পরে লস্করদিয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্র জানায়, বৃহস্পতিবার বিকেলে টেকনাফের রঙ্গীখালী এলাকার গহিন পাহাড়ে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে জিম্মি করে রাখা রোহিঙ্গাদের উদ্ধারে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন)। অভিযানের লক্ষ্য ছিল জিম্মি থাকা প্রায় ১২০ জনকে উদ্ধার করা। বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে যৌথ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে মানবপাচারকারী চক্র ও পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা অতর্কিত গুলি চালায়। শুরু হয় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি। এ সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে গুরুতর আহত হন সেনাসদস্য তিতাস। তার বুকের বাঁ পাশে ও কাঁধে গুলি লাগে।
তিতাসকে দ্রুত লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে নিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে করে রামু সিএমএইচে নেওয়া হয়। সেখানে রাত ৮টা ৪৮ মিনিটে চিকিৎসক তিতাসকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে, যৌথ বাহিনীর অভিযানে জিম্মি থাকা ৫৭ জনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। আটক করা হয় মানবপাচারকারী চক্রের কয়েকজন সদস্যকে। ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, একটি দেশীয় তৈরি বন্দুক ও চার রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।